বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার চিত্রটা কেমন।

বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটা মিশ্র — অনেক অগ্রগতি আছে, আবার বড় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। তার মধ্যে কিছু মূল পয়েন্ট আছে সেগুলো হলো:


কাঠামো ও নীতি

  • সরকারের ভিশন: সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা।
  • গ্রামীণ এলাকায় ৩ স্তরের ব্যবস্থা: কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কিন্তু শহরাঞ্চলে এখনো এমন সাজানো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো নেই
  • এখন ৫ম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রামে শহরের প্রাথমিক সেবা শক্তিশালী করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
    ২.সাম্প্রতিক অগ্রগতি
  • MDG-4 নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন, MDG-5 এর কাছাকাছি। এখন SDG যুগে ২০১৭-২০২২ এর ৪র্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শেষ করে পরবর্তী ধাপে কাজ চলছে
  • কমিউনিটি ক্লিনিক সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ কার্যক্রম। মা ও শিশু স্বাস্থ্যে এগুলো বড় ভূমিকা রাখছে
  • ডিজিটাল স্বাস্থ্য, অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, AMR নিয়ে নতুন উদ্যোগ চিহ্নিত হয়েছে
    ৩.বড় চ্যালেঞ্জগুলো
  • শহরে প্রাথমিক সেবার আওতা কম। মা-শিশু ও যৌন-প্রজনন স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সাধারণ প্রাথমিক সেবা বাড়ানো দরকার
  • স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি আছে।
  • বিশেষায়িত সেবা ঢাকা-কেন্দ্রিক। এটা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য উত্তরবঙ্গে ‘মেডিকেল সিটি’, দক্ষিণে নারী স্বাস্থ্য হাসপাতাল, পূর্বাঞ্চলে প্রবীণদের হাসপাতাল করার পরিকল্পনা চলছে — বিদেশি বিনিয়োগে!
    ৪.২০২৬ সালের কিছু আপডেট:
  • হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চলছে। ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ১৮ জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে-
  • শিশুদের নিউমোনিয়া পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি স্থগিত করা হয়েছে সেবা নিশ্চিত করতে
  • ৭ এপ্রিল ২০২৬ ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ এর প্রতিপাদ্য: “স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’
  • মেডিকেলে ইন্টার্নশিপ ১৮ মাস করা হচ্ছে, এর মধ্যে ৬ মাস গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক।
    বাংলাদেশে সরকারি vs প্রাইভেট স্বাস্থ্যসেবা — দুইটারই ভালো-মন্দ আছে। তুলনা করে দিচ্ছি:

(সরকারি স্বাস্থ্যসেবা)
কাঠামো কেমন:

  • ৩ স্তর: কমিউনিটি ক্লিনিক → ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র → উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স → জেলা সদর হাসপাতাল → মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
  • গ্রামে প্রাথমিক সেবার মূল ভরসা কমিউনিটি ক্লিনিক। এটা সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম

(ভালো দিক)
1.খরচ কম/ফ্রি: বহির্বিভাগ টিকিট ১০ টাকা, অনেক ওষুধ ফ্রি দেয়। গরিব মানুষের জন্য এটাই ভরসা
2.সারা দেশে নেটওয়ার্ক: প্রত্যন্ত গ্রামেও কমিউনিটি ক্লিনিক আছে
3.টিকাদান কর্মসূচি: EPI, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন সরকারই চালায়
4.মেডিকেল শিক্ষা: সব সরকারি মেডিকেল কলেজ, ইন্টার্নশিপে ৬ মাস গ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে
(সমস্যা)
1.শহরে দুর্বল : শহরাঞ্চলে সরকারি প্রাথমিক সেবার কাঠামো নেই, তাই মানুষ প্রাইভেটে যায়
2.ভিড় ও অব্যবস্থাপনা: জেলা/মেডিকেল কলেজে রোগীর চাপ অনেক, ডাক্তার-নার্স কম
3.বিশেষায়িত সেবা ঢাকা-কেন্দ্রিক: বড় অপারেশন, ক্যান্সার, হৃদরোগের জন্য ঢাকায় আসতে হয়। এটা বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা চলছে
4.দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা: স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একসাথে কাজ করে না

(প্রাইভেট স্বাস্থ্যসেবা)
কাঠামো কেমন:

  • প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ- শহরে ৮০% এর বেশি বহির্বিভাগ সেবা প্রাইভেট দেয়
    (ভালো দিক)
    1.সহজলভ্যতা: শহরে মোড়ে মোড়ে ক্লিনিক, সিরিয়াল কম
    2.সার্ভিস: এসি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ব্যবহার তুলনামূলক ভালো
    3.যন্ত্রপাতি: MRI, CT scan, আধুনিক টেস্ট প্রাইভেটে দ্রুত পাওয়া যায়
    4.বিশেষজ্ঞ ডাক্তার: বড় প্রাইভেট হাসপাতালে নামকরা ডাক্তাররা বসেন
    (সমস্যা)
    1.খরচ অনেক বেশি: সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই
    2.অপ্রয়োজনীয় টেস্ট: কমিশনের জন্য বেশি টেস্ট/ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ আছে
    3.গ্রামে নাই: লাভজনক না বলে প্রত্যন্ত এলাকায় প্রাইভেট হাসপাতাল যায় না
    4.মান নিয়ন্ত্রণ: সব প্রাইভেট ক্লিনিকের মান এক না। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি/মাইগ্রেশন নিয়ে সরকারকে নিয়মিত নির্দেশনা দিতে হয়
    (বর্তমান ট্রেন্ড ২০২৬)
    1.পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: বিশেষায়িত হাসপাতাল বিদেশি বিনিয়োগে করার পরিকল্পনা
    2.শহরে সরকারি সেবা বাড়ানো: ৫ম সেক্টর প্রোগ্রামে শহরের প্রাথমিক সেবা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে
    3.ডিজিটাল হেলথ: দুই খাতেই টেলিমেডিসিন, অনলাইন রিপোর্ট চালু হচ্ছে।
    4.মোট কথা: সরকারি সেবা = কম খরচ, বড় নেটওয়ার্ক, কিন্তু ভিড় ও ধীরগতি। প্রাইভেট = দ্রুত সেবা, ভালো পরিবেশ, কিন্তু খরচ অনেক বেশি আর শহরকেন্দ্রিক।
    সংক্ষেপে: গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ ভালো করেছে, বিশেষ করে কমিউনিটি ক্লিনিক দিয়ে। কিন্তু শহরের প্রাথমিক সেবা, বিশেষজ্ঞ সেবার বিকেন্দ্রীকরণ, আর দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এখন ডিজিটাল হেলথ, অসংক্রামক রোগ আর শহরের সেবা বাড়ানোর দিকে জোর দিচ্ছে।

প্রতিবেদক-
ওমর ফারুক
ঢাকা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *