জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক দলিল –

ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়। এই অভ্যুত্থানের ফলে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এক ব্যাপক প্রক্রিয়া শুরু হয়। তারই চূড়ান্ত ফলস্বরূপ ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ (সংক্ষেপে জুলাই সনদ) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়। এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সংবিধান সংস্কারের এক ঐকমত্যভিত্তিক রূপরেখা। সনদটিকে অনেকে “নতুন বাংলাদেশের সূচনা” বলে অভিহিত করেছেন।
এই প্রতিবেদনে জুলাই সনদের পটভূমি, গঠন প্রক্রিয়া, মূল প্রতিশ্রুতি, সাংবিধানিক ও আইনি সংস্কার, বাস্তবায়নের রূপরেখা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং জাতীয় জীবনে এর তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণরূপে সনদের আনুষ্ঠানিক দলিল, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের উপর ভিত্তি করে তৈরি।

ঐতিহাসিক পটভূমি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এক মাইলফলক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তীকালীন বিভিন্ন আন্দোলনের ফলে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণতন্ত্রের ক্রমাগত ক্ষয় দেখা যায়। স্বৈরাচারী শাসন, নির্বাচনী ব্যবস্থার ধ্বংস, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের দলীয়করণ এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার জনগণকে ক্ষুব্ধ করে।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে একদফা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এতে এক হাজার চারশোর বেশি নিরস্ত্র নাগরিক নিহত এবং বিশ হাজারের বেশি আহত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় (সংবিধান, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন)। কমিশনগুলো ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সুপারিশ জমা দেয়।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। সভাপতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করে এবং তিন দফায় ৭২ দিন রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে আলোচনা চালায়। প্রথম পর্যায়ে ১৬৬টি বিষয়ের মধ্যে ৬৪টিতে ঐকমত্য হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আরও আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়। ২৮ জুলাই খসড়া চূড়ান্ত হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হয়। ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে বাস্তবায়ন রূপরেখা নিয়ে আলোচনা চলে।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠান এবং অংশগ্রহণকারী দলসমূহ
১৭ অক্টোবর ২০২৫, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সনদ স্বাক্ষরিত হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২৫টি দল স্বাক্ষর করে। স্বাক্ষরকারী দলসমূহের তালিকা নিম্নরূপ:

ক্রমদল/জোটস্বাক্ষরকারী
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)রেদোয়ান আহমেদ, নেয়ামুল বশির
খেলাফত মজলিসমাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ, আহমদ আবদুল কাদের
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনহাসনাত কাইয়ুম, সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন
আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ
নাগরিক ঐক্যমাহমুদুর রহমান মান্না, শহীদুল্লাহ কায়সার
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)ববি হাজ্জাজ, মোমিনুল আমিন
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সালাহউদ্দিন আহমদ
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসমাওলানা ইউসুফ আশরাফ, মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, মিয়া গোলাম পরওয়ার
১০গণসংহতি আন্দোলনজোনায়েদ সাকি, আবুল হাসান রুবেল
১১জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – জেএসডিশহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, তানিয়া রব
১২গণ অধিকার পরিষদনুরুল হক নুর, মো. রাশেদ খাঁন
১৩বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসাইফুল হক, বহ্নিশিখা জামালী
১৪জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটফরিদুজ্জামান ফরহাদ (এনপিপি), বীর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার লুৎফর রহমান (জাগপা)
১৫১২-দলীয় জোট / বাংলাদেশ এলডিপিমোস্তফা জামাল হায়দার, শাহাদাত হোসেন সেলিম
১৬ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশঅধ্যাপক আশরাফ আলী আকন, মাওলানা গাজী আতাউর রহমান
১৭জাকের পার্টিশহীদুল ইসলাম ভুইয়া, জহিরুল হাসান শেখ
১৮জাতীয় গণ ফ্রন্টআমিনুল হক টিপু বিশ্বাস, মঞ্জুরুল আরেফিন লিটু বিশ্বাস
১৯নেজামে ইসলাম পার্টিমাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, মাওলানা মুসা বিন ইযহার
২০বাংলাদেশ লেবার পার্টিমোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খন্দকার মিরাজুল ইসলাম
২১ভাসানী জনশক্তি পার্টিশেখ রফিকুল ইসলাম (বাবলু), মোহাম্মদ আবু ইউসুফ (সেলিম)
২২জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশমাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, মাওলানা মঞ্জরুল ইসলাম আফেন্দী
২৩ইসলামী ঐক্যজোটমাওলানা আব্দুল কাদের, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী
২৪আমজনতার দলকর্নেল (অব.) মিয়া মশিউজ্জামান, মো. তারেক রহমান
২৫গণফোরাম (১৯ অক্টোবর স্বাক্ষর)সুব্রত চৌধুরী, ডা. মো. মিজানুর রহমান

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ স্বাক্ষর করেনি। তারা অভিযোগ করে যে সনদে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে এবং মৌলিক নীতিমালা পরিবর্তনের চেষ্টা আছে। গণফোরাম প্রথমে উপস্থিত থাকলেও পরে স্বাক্ষর করে। এনসিপি ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর করে।

সনদের মূল প্রতিশ্রুতি—

  • সনদে মোট ২৮টি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এতে রাষ্ট্রভাষা, নাগরিকত্ব, সংবিধান সংশোধন, জরুরি অবস্থা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত। সনদের পটভূমিতে বলা হয়েছে: “সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে… একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
  • সাংবিধানিক পরিবর্তন (৪৭টি প্রস্তাব)
  • সনদ পাস হলে সংবিধানে নিম্নলিখিত ৪৭টি পরিবর্তন আসবে:
  • বাংলার পাশাপাশি সকল মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
  • নাগরিকত্ব “বাঙালি”-র পরিবর্তে “বাংলাদেশী”।
  • সংবিধান সংশোধনে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ও উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট।
  • ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত।
  • মূলনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সামাজিক সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
  • নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা মৌলিক অধিকার।
  • জরুরি অবস্থায় মন্ত্রিসভা, বিরোধীদলীয় নেতা-উপনেতার অনুমোদন প্রয়োজন; মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচন গোপন ব্যালটে, নিম্নকক্ষের সদস্যদের দ্বারা।
  • রাষ্ট্রপতির অভিশংসন উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে।
  • প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর।
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল (শাসক দল, প্রধান বিরোধী দল, দ্বিতীয় বিরোধী দলের ঐকমত্যে)।
  • দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা; উচ্চকক্ষ ১০০ আসন (ভোটের অনুপাতিক হারে)।
  • নারীদের সংরক্ষিত আসন পর্যায়ক্রমে ১০০ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
  • ৭০ অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত (ফ্লোর ক্রসিং নিষিদ্ধতা তুলে)।
  • নির্বাচন কমিশন গঠনে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেতা ও প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধান।
  • বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালীকরণ।
  • ন্যায়পাল নিয়োগে স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী নেতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের তত্ত্বাবধান।
  • পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহা-হিসাব নিরীক্ষক, দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়োগে বিরোধী দলসমন্বিত কমিটি।
  • সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত।
  • আইনি সংস্কার (৩৭টি প্রস্তাব)
  • বিদ্যমান আইন সংশোধনের মাধ্যমে ৩৭টি সংস্কার: সংসদীয় কমিটির অধিকার নির্ধারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার আইনি স্বীকৃতি, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন (পিএসসি বিভক্তকরণ), কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠন ইত্যাদি।
  • বাস্তবায়নের রূপরেখা
  • ২৮ অক্টোবর ২০২৫-এ কমিশন গণভোটের সুপারিশ করে। প্রশ্ন: “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তফসিল-১ এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?” ত্রয়োদশ সংসদকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে ২৭০ দিন কার্যকর রাখা। উচ্চকক্ষ (১০০ সদস্য) গঠন। যদি সময়মতো না হয়, গণভোটে পাস বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে প্রতিস্থাপিত।

সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস একে “নতুন বাংলাদেশের সূচনা” বলেন। কিন্তু সমালোচনা রয়েছে: অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী-শ্রম অধিকারে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব নেই (অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানের মতে)। বিএনপি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পক্ষে কিন্তু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে। বাম দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করে।

উপসংহার

জুলাই সনদ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দলিল। এটি স্বৈরাচার প্রতিরোধ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন পেলে এটি “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র” গঠনে সহায়ক হবে। তবে বাস্তবায়নের সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, জনসমর্থন এবং পরবর্তী সংসদের দায়িত্বশীলতার উপর। এই সনদ শুধু সংস্কার নয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে এটি এক অমূল্য দিশা।
সূত্র: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দলিল, সনদের আনুষ্ঠানিক পাঠ্য, সরকারি গেজেট ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন।

প্রতিবেদক-

তানজিদুর রহমান অসীম
ঢাকা কলেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *